Monday, 28 July 2014

সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাচ্ছে রাজ্য, খুশি নয় কেন্দ্র

 জয়দেব দাস, ক্যানিংঃ সুন্দরবনে ক’টি বাঘ রয়েছে এখনও ধোঁয়াসা রয়েই গিয়েছে। রাজ্যের বন কর্তারাও জোর দিয়ে বলতে পারছেন না বাঘের আসলে ক’টি বাঘ রয়েছে ? এতদিন পর্যন্ত রাজ্য সরকার বাঘের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাচ্ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারকেও সেই হিসাব দিয়ে আসছিল। কিন্তু কেন্দ্র তা মানতে চায়নি। রাজ্যকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র নিজের উদ্যোগে সরকারি এবং বেসরকারি দু’ভাবেই গণনার কাজ করাছে।  সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা গণনা করে ৯০-১০০ টি বাঘ থাকার বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে রাজ্যের বন কর্তারা। রীতিমতো বিপাকে পড়ে গিয়েছে তারা। এই তথ্য নিয়েও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে অনেকের মধ্যে। দ্বিমত দেখা দিয়েছে বন  আধিকারিকদের মধ্যেও। বাঘ বাঁচাতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। বাঘের সংখ্যা বাড়া তো দূরের কথা, দিনের পর দিন তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক এবং প্রধান মন্ত্রীর উদ্যোগে গঠিত টাস্কফোরস। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের অধিকর্তা সৌমিত্র দাশগুপ্ত বলেন, ‘সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা একশোর বেশি রয়েছে। বাঘের প্রকৃত সংখ্যা জানার জন্য গণনার কাজ চলছে। শেষ হলে আসল তথ্য সামনে আসবে।’ বাঘের সংখ্যাটি আরও বাড়বে বলে তাঁর বিশ্বাস।   
২০০৪ সালের সর্বশেষ গণনা আনুসারে ১১০ টি দ্বীপে ২৭৪ টি বাঘের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল। দশ বছরে ৮ টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। তার পরও সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছিল। সরকারি হিসাবে দেখানো হয়েছে, ৪ হাজার ২৬৪ বর্গ কিমি এলাকায় বাঘ রয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যা মানতে চায়নি এনজিওরা। দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠায় তথ্য প্রমান করাতে বন কর্তারা ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসের ৬ তারিখ থেকে তড়িঘড়ি পুনরায় গণনার কাজ শুরু করেছিল। এনজিও বা কেন্দ্রীয় সরকার যাতে সহজে প্রশ্ন তুলতে না পারে তাই একাধিক দফায় তা গণনা করা হচ্ছে। আজও তা শেষ হয়নি সেই কাজ। টানা আট বছর ধরে তো চলছে। ইতিমধ্যে চারজন আধিকারিক বদলি হয়ে গিয়েছে। গণনার কাজ শেষ হচ্ছে না।
রাজস্থানের সরিস্কার জঙ্গল থেকে বাঘ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সারাদেশ তোলপাড় হয়ে ছিল। পরে প্রধান মন্ত্রী  মনমোহন সিংয়ের উদ্যোগে এবং তাঁর নেতৃত্বে বাঘ সংরক্ষণ বিষয়ে একটি ‘টাস্কফোরস’ গঠন করা হয়েছে। পদাধিকার বলে প্রধান মন্ত্রী তার চেয়ারম্যান। তিনি নিজেই বিষয়টি দেখছেন। বিশেষ ভাবে নজর দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনের বাঘের বিষয়ে। কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর সুন্দরবনে বাঘের প্রকৃত সংখ্যা জানতে ২০১২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় প্রশ্ন উঠেছিল। সুন্দরবনে বাঘেরা কেমন রয়েছে, তাদের হাল হকিকত জানতে টাস্কফোরসের পরামর্শে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ওই বছর ১৩ ডিসেম্বর সুন্দরবনে এসে ছিলেন। সরকারি লঞ্চ নিয়ে তাঁরা টানা তিন দিন ধরে গভীর বনের ধারে ধারে বাঘের ডেরায় ঘুরেও একটি বাঘেরও দেখা পাননি। হতাশ হয়ে  ভ্রূকুঁচকে চলে গিয়েছেন। পরে তাঁদের দেওয়া রিপোর্টেরভিত্তিতে ‘ওয়ার্ড ওয়াইল্ড ফান্ড ফর নেচার’(ডব্লু ডব্লু এফ) নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেরাদুনে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড়ো বাঘ গবেষণা কেন্দ্র ‘ইন্ডিয়ান  ইন্সটিটিউট অব ওয়াইল্ড লাইফ’(আই আই ডব্লু) আলাদা আলাদা ভাবে সমীক্ষা শুরু করেছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে তারা বনের বিভিন্ন জায়গায় স্বয়ংক্রিয় ক্যামেয়া বসিয়ে বাঘের শরীরের বিভিন্ন অংশের ছবি তু্লে তাদের বয়স জানার চেষ্টা করছে। বাঘ কেন বারবার গ্রামে চলে আসে তা জানতে এবং গতিবিধি পরখ করতে গলায়  ‘রেডিওকলার’, কানে ‘ইয়ারট্যাগ’ বেঁধে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে তারা। তাদের খাদ্যশৃঙ্খল সম্পর্কেও ধারণা করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে ডব্লু ডব্লু এফ একবছর ধরে গণনার পর প্রাথমিক ভাবে একটি  হিসাব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। সেই তথ্যেই ৯০-১০০ টি বাঘ থাকার বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ওই সংস্থার বাঘ বিশেষজ্ঞ  অনুরাগ দন্ড বলেন, ‘সুন্দরবনে আপাতত মোটামুটি শ’খানের বাঘ রয়েছে। আর দু-একটি কমবেশী হতে পারে।’  তবে ক্যামেরা বসিয়ে এখনও বাঘের ছবি তোলার কাজ চলছে।’ অন্য সংস্থাটি আই আই ডব্লুর’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।     

No comments:

Post a Comment