Sunday, 19 February 2017

রূপান্তরিত নারীর প্রথম আইনি বিয়ে দেশে, পাত্রী কলকাতার শ্রী

আটপৌঢ়ে বাঙালি বিয়ে যেমন ভাবে হয় ঠিক তেমনটাইবিয়ের আগে কেনাকাটা থেকে শুরু করে আইবুড়ো ভাতএর পর নান্দীমুখ, জল সইতে যাওয়া, গায়ে হলুদ- সবই হয়েছিল নিময় মেনেইবিয়ের দিন সন্ধ্যায় 'যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম' মন্ত্রে ভরে উঠেছিল গোটা বিবাহ বাসরদিনটা ছিল ২০১৬-র ১৭ ফেব্রুয়ারিষোলো বছরের বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা হয়ে ওঠা সম্পর্ক সমাজের বাধা-ধরা নিয়মের গণ্ডি পেরিয়ে পরিপূর্ণতা পেয়েছিল সে দিনমিলেছিল সামাজিক স্বীকৃতিবিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন শ্রী ও সঞ্জয়গোটাটাই হয়েছিল আর পাঁচটা বিয়ের মতোইতবুও কোথায় যেন এই বিবাহ অনুষ্ঠানটি ছিল এক্বেবারে স্বতন্ত্রআসলে শ্রীয়ের বিয়ে বলে কথা
শ্রী কোনও সেলেব?

সেই অর্থে নয়থিয়েটারে অভিনয় করলেও তাঁর জীবনের লড়াই-ই তাঁকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেতাঁর জীবন কাহিনি যে খুব একটা সহজ নয়একে ঠিক শ্রীয়ের একার গল্প বলাটাও ভুল হবেশ্রীকে কেন্দ্র করে এ হল সমাজকে দুই ছাপোষা পরিবারের ঝাঁকানি দেওয়ার বাস্তব গল্পরূপান্তরিত মহিলা শ্রী ঘটক মুহুরি ও তাঁর স্বামী সঞ্জয় মুহুরি তাঁদের দুই পরিবারের মত নিয়ে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেনসেই ঘটনার বয়স হয়ে গেল গোটা একটা বছরএ বার প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর দিন গোটা দেশে নজিরও সৃষ্টি করলেন শ্রীতিনিই সম্ভবত প্রথম ভারতীয় রূপান্তরিত মহিলা, যিনি আইনত বিয়েটা সেরে ফেললেন


 আর পাঁচটা বিয়ে তো আইন মেনে হয়, তবে তাঁদের বিয়েটায় কেন সরকারি সিলমোহর লাগবে না? এক দিন সঞ্জয়কে এই মনের কথাটা বলেও ফেলেছিলেন শ্রীএটা যে সঞ্জয়েরও ইচ্ছে ছিলঅবশেষে বাগুইআটির একটি হোটেলে গত শনিবার বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সেরে ফেললেন এই দম্পতিসামাজিক বিয়ের এক বছর বাদে আইনি বিয়ের পথটা ততটা মসৃণ ছিল নাগোটা পরিবার মেনে নিলেও আইনি পথে বিয়ে নিয়ে সমস্যাটা ছিলইএকটা পুত্রশিশুর শরীর নিয়ে জন্মালেও বড় হয়ে ওঠা মনটা তো ছিল নারীরইএরপর ধীরে ধীরে 'পুরুষালি' শরীরটায় একটু একটু করে 'নারীত্ব' গড়ে তোলাএখন তো শ্রী পুরোপুরি 'শ্রীমতি'কিন্তু সমস্ত নথিতেই তাঁর পরিচয় ছিল পুরুষ হিসেবেঅতএব সব নথি থেকেও 'পুরুষালি' চিহ্ন মুছে ফেলার প্র্রক্রিয়া শুরু হলকারণ আইনত নারী না হলে এ দেশে পুরুষের সঙ্গে আইনি বিয়ে অসম্ভবসামাজিক বিয়ের পর এই সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে একটা বছর সময় লাগলঅবশেষে মধুরেণ সমাপয়েত্‍

অনুষ্ঠানে সব সময় বৌমার পাশে পাশে দেখা গেল শ্রী-র শ্বশুর সমীর মুহুরিকেরেজিস্ট্রেশনের সময় তিনিই প্রথম সাক্ষী হিসেবে সই-সাবুদ সেরে শোনালেন তাঁদের বাড়িতে বৌমা আসার পর আনন্দের জোয়ার বয়ে যাওয়ার কাহিনি-''এই তো মাসকয়েক আগে আমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলামতখন তো বৌমাই হাসপাতাল-বাড়ি করে আমায় সারিয়ে তুললআর ওঁর হাতের খাসির মাংস তো অসাধারণএকটা দিন বাড়িতে না থাকলে গোটা বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগেহ্যাঁ শুরুতে কিন্তু কিন্তু ভাব ছিল ঠিকইতবে আমার বড় ছেলের ওঁর প্রতি ভালবাসা আমাকে অনেকটাই সহজ করে তুলেছিল।''

কথাটা শুনেই কিছুটা লাজুক শ্রী-এর স্বামী সঞ্জয়গলায় দুরন্ত দৃঢ়তা নিয়ে বললেন, ''বিষয়টা সবার পক্ষে হজম করা কঠিনআমার বউ কিছু দিন আগেও শরীরে ছেলে ছিলকিন্তু সমস্ত বাধা কাটিয়ে উঠে আজ আমরা আইনত স্বামী-স্ত্রীবছরখানেক আগে আমাদের বিয়ের খবর যখন খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল, তখন তা নিয়ে কম চর্চা হয়নিপাড়া থেকে অফিস সর্বত্রই আলোচনা হয়েছেকিন্তু ধীরে ধীরে ওঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছেএই তো দেখুন না আজকের অনুষ্ঠানে সবাই কত আনন্দ করেছেসবাই মেনে নিয়েছে।'' সঞ্জয় যেমন শ্রী-এর হাতটা শক্ত করে ধরে রয়েছেন, তেমনই সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ রূপান্তরিত বা রূপান্তর আকাঙ্খীদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিন- এটাই শুধু তাঁর চাহিদাসঞ্জয়ের চোখে তাঁর স্ত্রী শুধুমাত্র ভালবাসাই নয়, আদর্শও বটেশ্রী-এর হাতে হাত রেখেই জানালেন- ''শ্রীয়ের জীবন ওঁর মতো আরও অনেকে জানুকতাঁরাও নিজের শর্তে বেঁচে থাকার সাহস পাক।''
সল্টলেট বৈশাখীর সরকারি আবাসনে বেড়ে উঠেছেন শ্রীবাড়ির বড় 'ছেলে'। 'পুরুষবেলা'র নাম ছিল অন্যবাবা সরকারি চাকুরেসে সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার এত রমরমা ছিল নাইন্টারনেটও ছিল সীমিত আয়ত্তের মধ্যেতাঁর নিজের 'জানা'-র জগতের ব্যাপ্তিও ছিল কমরূপান্তরকামীদের অস্তিত্ব, আন্দোলন, জীবন সম্পর্কে অজ্ঞই ছিলেন শ্রী নিজেওআবাসনে মেয়েরাই ছিল তাঁর বন্ধুনিজেকে অস্বাভাবিক না-ঠেকলেও চারপাশের মানুষের চোখে সেটাই ধরা পড়ততখন ক্লাস ফোর-ফাইভসিঁড়ির নীচের ঘুপচি-তে আবাসনের কিছু বড় ছেলে আচমকা জাপটে ধরতচুমু খেততাঁর মেয়েলি স্বভাব আর হাবভাব নিয়ে সমস্যা শুরু হল বাড়িতে-স্কুলেওহাসি, মসকরা, আলোচনা, মন্তব্য, ঠেস, বকুনি- ক্রমশ নিজের ভিতরেই একটা বদ্ধ কুঠুরিতে আটকে যাচ্ছিল শ্রীয়ের সত্তাকিন্তু তাঁর মা পূর্ণিমা ঘটক আর সঞ্জয়ের হাত ধরে এখন শ্রী সম্পূর্ণ নারী

শ্রী-য়ের কথায়, তাঁর মা এবং সঞ্জয়-এই দু'জন না থাকলে কবে, কোথায় ভেসে যেতেন জানা নেইক্লাস এইটে কেষ্টপুরের একটি অনামী স্কুলে ভর্তি হয়ে দেখা হয় সঞ্জয়ের সঙ্গেকিন্তু সে সময় কোনও প্রেমটেম ছিল নাক্রমশ অনেকগুলো বছর পাশাপাশি চলতে চলতে কখন যেন বন্ধুত্ব, মায়া-মমতা-সহানুভূতি-প্রেম সব একাকার হয়ে গেলশারীরিক ভাবে মেয়েতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেন শ্রীপুরো খরচটাই জোগালেন সঞ্জয়অসম্ভব কঠিন একটা প্রক্রিয়াযেমন শরীরে যন্ত্রণা হয়, তেমনই মানসিক ভাবে ছিন্নভিন্ন হতে হয়বাড়ির লোকেদের সহানুভূতি এই সময় ভীষণভাবে দরকার পড়েএকটি বিরাট প্রক্রিয়া। ''কিন্তু এই প্রক্রিয়ার জন্য আমার বেশি দিন সময় লাগেনিকেননা রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপ হল মানসিক ভাবে শক্ত হয়ে ওঠাযেহেতু আমি আত্মপ্রত্যয়ী ছিলাম তাই সময়টা কম লেগেছিলতবে যখন হরমোন প্রক্রিয়া শুরু হলসে সময়টা আমার জীবনের সব চাইতে কঠিন সময় ছিলএই সময়টায় মেয়েদের পোশাক পরে বাইরে বেরোনো শুরু করতে হয়তখন ভয়ানক টিটকিরি, বিদ্রুপের মুখে পড়তামএক দিন বিধানগর স্টেশনে ট্রেন ধরবো বলে দাঁড়িয়েএক দল ছেলে বিভিন্ন ধরনের অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল আমায় দেখেতখনও আমার শরীর পুরোপুরি 'মেয়ে' হয়ে ওঠেনিতাই আমায় নিয়ে বহুক্ষণ ধরে চলল হাসাহাসিকাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলামবাড়ি থেকে বাইরে বের হতে ভয় হতমা তখন আমায় সাহস জোগাতোবলত আমায় ফোন করবি, আমি গিয়ে নিয়ে আসবো।''
অপারেশনের পরে সবচেয়ে বড় টেনশন ছিল হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে নিয়েসঞ্জয় বললেন, ''আমি বাড়ির বড় ছেলেআমার ক্লাসের বন্ধু হিসেবে শ্রীকেও আমার বাড়িতে সবাই ছোটবেলা থেকে দেখেছেন প্যান্ট-শার্ট পরা একটা ছেলে হিসাবেহঠাত্‍ করে আপনার বাড়ির ছেলে যদি বলে যে, সে তার এক পুরুষ বন্ধুকে সামাজিক ভাবে বৌ করে আনতে চায় তা হলে আপনি কি প্রথমে সহজভাবে নেবেন? বরং আমি অনেক ভাগ্যবান যে, আমার বাড়িতে শেষ পর্যন্ত সবাই শ্রী-কে বুকে টেনে নিয়েছেন।''

শ্রীয়ের এখন ভরা সংসারমাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত স্বামীশ্বশুর, শাশুড়ি, দেওর নিয়ে জমজমাট সুখী পরিবারআছে একটি ছোট্ট পোষ্য ব্রাউনিওবন্ধুদের একটাই আক্ষেপ, যদি ওঁদের একটা সন্তান হতো তা হলে ওঁরা পরিপূর্ণতা পেত আর কোনও আক্ষেপই থাকত নাকিন্তু বিজ্ঞান এখনও সেই পথ দেখিয়ে উঠতে পারেনিতাতে খুব একটা আক্ষেপ নেই শ্রী এবং সঞ্জয়েরসন্তান দত্তক নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছেন তাঁরাএরই সঙ্গে চালু করেছেন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, নাম 'ত্রয়ী ফাউন্ডেশন'এই সংস্থা শ্রী-এর মতো মানুষদের নিয়ে কাজ করেতাঁদের অসময়ে পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে মানসিক ভাবে সাপোর্ট দেওয়া হয়এখানেই শেষ নয়, পথশিশুদের পড়াশোনায় সাহায্যের পাশাপাশি মূক ও বধির, প্রতিবন্ধী মানুষজনের পাশে দাঁড়ানোই ত্রয়ী ফাউন্ডেশনের কাজশ্রী-এর কথায় এই সংস্থাই এখন আমার সন্তানএই সংস্থাকে বড় করে তোলাটাই এখন আমার লক্ষ্যআর এই কাজে তিনি পাশে পেয়েছেন তাঁর স্বামী সঞ্জয়, তিস্তা দাস, বিমান পাল, মোনালিসা বোস, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে
শ্রীয়ের আক্ষেপ শুধু একটাই- ''সবাই বলছে আমি বড় কাজ করেছিসবাই সাধুবাদ দিচ্ছেনকই সরকার তো আমায় কোনও স্বীকৃতি দিচ্ছে নাআমার মতো মানুষজন সমাজে এখনও ব্রাত্য। 'এলজিবিটি কমিউনিটি'র মানুষজনের হয়ে কাজ করার জন্য কোনও সাহায্য তো করছে না সরকারআমায় ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সজেন্ডার ওয়েলফেয়ার বোর্ড-এর সদস্য করা হচ্ছে না তোএই সদস্য পদ পেলে আমি আরও অনেক বেশি কাজ করতে পারতাম আমার মতো মানুষজনদের জন্য।''
কলকাতার এক প্রান্তে গতভাঙা-বলিষ্ঠ পদক্ষেপে শ্রীময় হয়ে উঠছে একটা সংসারআর তাঁদের মতো আরও আরও এমন অনেক সংসার ভবিষ্যতে রঙীন হয়ে উঠবে বলেই আশা শ্রী এবং সঞ্জয়েরআরও আশা, সমাজ এই স্বাভাবিকটা স্বাভাবিক হিসেবেই দেখবে, দেখতে জানবে, দেখতে শিখবে এক দিন


No comments:

Post a Comment